admin
৪ জুন ২০২৬, ৫:৩৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

অদম্য প্রত্যয়ের উপাখ্যান : রিকশার চাকা থেকে ডেইরি খামারের শ্বেত বিপ্লব

শেয়ার

এনজিও বার্তা ডেস্ক

জীবনের চরম বিপর্যয় ও লোকসানের মুখে পড়ে যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়, তখন কেউ কেউ সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই নতুন করে গড়ে তোলেন এক রূপকথার সমতুল্য বাস্তব। ঢাকার চকমিলানো যান্ত্রিক জীবনের ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে, গ্রামীণ জনপদে ফিরে এসে এক প্রান্তিক মানুষের আত্মপ্রত্যয়ী পথচলার গল্প আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি কেবল এক খামারির ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনী নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন ও ক্ষুদ্রঋণের সঠিক ব্যবহারের এক প্রামাণ্য দলিল।

এক সময় রাজধানী ঢাকায় ছোটখাটো এক ব্যবসায় নিজের ভাগ্য অন্বেষণ করছিলেন মোহাম্মদ রতন মিয়া। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হতে হয় তাকে। পুঁজি হারিয়ে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জীবনের গতিপথ যখন থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন থিতু হতে বাধ্য হন আপন গ্রামে। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বেছে নেন অটোরিকশার হাতল। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যান্ত্রিক চাকা ঘুরিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে দিনানিপাত চললেও মনের গহীনে জ্বলছিল ভিন্ন এক স্বপ্নের সলতে। ছোটবেলা থেকেই অবলা গবাদি পশুর প্রতি এক সহজাত টান ও ভালোবাসা ছিল রতনের। সেই ভালোবাসাই একসময় তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রধান অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়।

শখের বাছুর থেকে স্বপ্নের যাত্রা

অটোরিকশা চালিয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব অনুধাবন করে রতন মিয়া একদিন এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আয়ের একমাত্র উৎস অটোরিকশাটি বিক্রি করে দিয়ে সেই অর্থে শখ করে কিনে নেন দুটি বাছুর। কিন্তু স্বপ্ন তো আর স্থির থাকে না; পরম যত্নে বাছুর দুটিকে বড় করে তোলার পর সেগুলো বিক্রি করে দেন তিনি। সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ এবং সঞ্চিত পুঁজির সঙ্গে কিছু শক্তি ফাউন্ডেশন থেকে ঋণ যুক্ত করে এক লক্ষ নব্বই হাজার টাকা মূল্যের একটি গর্ভবতী গাভী ক্রয় করেন। রতন মিয়ার জীবনের মোড় পরিবর্তনের সেই ছিল মাহেন্দ্রক্ষণ। অদম্য ইচ্ছা আর নিরলস শ্রমের মেলবন্ধনে সেই একটিমাত্র গাভী থেকে আজ তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮টি।

মোহাম্মদ রতন মিয়া তার অতীত স্মৃতি হাতড়ে বলেন,  “এর আগে আমি অটো গাড়ি চালাইতাম। গাড়ি চালানীর পরে আমি একটা বাছুর কিনি মানে শখ কইরা। বাছুর কিন্নার পরে, পরে এইডার পাশাপাশি আরেকটা বাছুর কিনি। পরে দুইডা বাছুর বেচ্চা সাইরা আর কিছু টেহা রুন উঠাই, উঠা সাইরা একটা গাভী কিনছি এক লক্ষ নব্বই হাজার টাকা দিয়া। পরে এভাবে এভাবে হইরা আমি আজকে এতটুক আইছি। এখন বর্তমানে আমার আঠাশটা গরু আছে বাছুর লইয়া।”

যৌথ প্রয়াস ও নিষ্ঠার যুগলবন্দি

রতন মিয়ার এই সাফল্যের ইমারত কিন্তু একা গড়ে ওঠেনি। এই মহাযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে এক অনন্য দাম্পত্য নিষ্ঠা। প্রতিদিন ভোর চারটে থেকে শুরু হয় এই দম্পতির কর্মব্যস্ততা। খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে ঘাস ও সুষম দানাদার খাদ্য প্রস্তুত করা—সবকিছুই তারা করেন নিজেদের হাতে। কোনো বহিরাগত শ্রমিকের ওপর নির্ভর না করে, পরম মমতায় তারা আগলে রেখেছেন তাদের খামারকে। রতন মিয়া অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করেন যে, গবাদি পশুর সুস্থতা ও খামারের লাভজনকতা সম্পূর্ণ নির্ভর করে খামারির নিজস্ব শ্রম ও তদারকির ওপর।

আজকের ডেইরি শিল্পে যেখানে অনেকেই লোকসানের খতিয়ান তুলে ধরেন, সেখানে রতন মিয়া ও তার স্ত্রী হালিমা বেগম এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খড়, কাঁচা ঘাস এবং পরিমিত দানাদার খাদ্যের সুষম মিশ্রণ তৈরি করে তারা গবাদি পশুর পুষ্টি নিশ্চিত করেছেন। তাদের এই খাটুনির ফলেই আজ তাদের খামার শতভাগ লাভজনক এক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।

রতন মিয়া বলেন: “হাড়াহাড়ি বলতে এটা গাভীর তুলে অনেক খাটন। নিজেরা যত খাটবেন ততই গরু সুস্থ থাকব, ভালো থাকব। আর বলে না, আমি খাবার তো দিয়েই দিছি আমি চলে যাই—তাহলে ভাই কেউ ফারাম কইরা কেউই পারবো না, মানে লস, সবারই লস হইবো। অনেকেই বলে ফারাম কইরা লস, আমরা কাছে লস হয়া না কারণ এইটাই, আমরা দুনো জনই খাড়ি।”

ক্ষুদ্রঋণের আশীর্বাদ ও শ্বেত বিপ্লব

খামারের পরিধি বাড়াতে এবং এটিকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক রূপ দিতে প্রয়োজন ছিল আর্থিক প্রণোদনার। এই সন্ধিক্ষণে রতন মিয়ার সহধর্মিণী হালিমা বেগমের দূরদর্শিতায় পাশে দাঁড়ায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘শক্তি ফাউন্ডেশন’। শক্তি ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত ঋণ যেন তাদের এই স্বপ্নের পালে নতুন হাওয়া দেয়। সেই ঋণের অর্থের সঠিক বিনিয়োগে খামারের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।

বর্তমানে এই ডেইরি খামারটি কেবল এই পরিবারের আয়ের উৎসই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নীরব শ্বেত বিপ্লবের সঞ্চার করেছে। প্রতিদিনের দুধ বিক্রির লভ্যাংশ থেকে সমস্ত পারিবারিক ব্যয় ও খামারের পরিচালনা খরচ মিটিয়েও প্রতি সপ্তাহে এই দম্পতির ঘরে আসছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রতি বৃহস্পতিবার যখন সপ্তাহের হিসাব মেলানো হয়, তখন রতন-হালিমার মলিন মুখে ফুটে ওঠে এক অনাবিল তৃপ্তির হাসি।

রতন মিয়া তৃপ্তির সুরে জানান:  “আমরা কোনো দিনের হিসাব করি না, প্রতি সপ্তাহে আপনের আটচল্লিশ হাজার টাকা বা উনপঞ্চাশ হাজার টাকা এরকমভাবে প্রত্যেক দিনে আসে, সপ্তাহ। মানে বিষুদবার তে বিষুদবারে হিসাব থাকে।”

অনুপ্রেরণার এক নতুন বাতিঘর

মোহাম্মদ রতন মিয়া এবং হালিমা বেগমের এই যৌথ সংগ্রাম আজ দেশের বেকার যুবসমাজ এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা। তারা প্রমাণ করেছেন, সততা, সঠিক পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে শূন্য থেকে শুরু করেও সাফল্যের শিখরে আরোহণ করা সম্ভব। এনজিও এবং ক্ষুদ্রঋণ যে গ্রামীণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, রতন মিয়ার এই ডেইরি খামার তার এক জীবন্ত উপাখ্যান। অন্ধকার ভেদ করে আলোয় ফেরার এই গল্প ছড়িয়ে পড়ুক বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে।

এনজিও বার্তা/আরই/এসএ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাদক মুক্ত কালিহাতী গড়তে চাই : জসিম খান

মির্জাপুরে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

বাজেটে বাড়ছে সিগারেটের দাম

জাতির প্রত্যাশা পূরণে এবারের বাজেট করা হয়েছে : অর্থমন্ত্রী

সমবায় সমিতি নিবন্ধন করার সহজ আইনি ধাপ ও প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরির সুযোগ

দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ সহায়তা দেবে জাপান

এনজিও ও এমএফআই খাতের প্রফেশনাল অনলাইন দর্পণ ‘এনজিও বার্তা’

সন্তান জন্মের পর কর্মজীবী মায়ের নতুন লড়াই

কোন বয়সে পুরুষের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা সবচেয়ে ভালো থাকে?

১০

টানা ৩০ দিন ধরে ডাবের পানি পানে যা ঘটে শরীরে

১১

চোখের দৃষ্টি ভালো রাখতে যে ৫ খাবার খাবেন

১২

প্রদাহ থেকে হতে পারে এই ৩ রোগ, যেভাবে সুস্থ থাকবেন

১৩

পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধে বরাদ্দ ২১০০ কোটি টাকা

১৪

গুলশানে জমি কেনার অনুমোদন পেল মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক

১৫

ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকোর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, কার্যকর মঙ্গলবার

১৬

ফাউলের অভিনয় করলেই দেখতে হবে হলুদ কার্ড

১৭

কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে পিকেএসএফ ও সিমিটের যৌথ উদ্যোগ

১৮

একনেকে উঠছে ৩৪৪ কোটি টাকার বিতর্কিত প্রকল্প

১৯

এনজিওর মাঠপর্যায়ে কাজের মানসিক চাপ কমানোর ৫টি বাস্তব উপায়

২০