এনজিও বার্তা ডেস্ক
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে ‘মালিক নির্ভর শাসন কাঠামো’ যেভাবে গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে এবার নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কারে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট করে দিয়েছেন—ব্যাংকের মালিক মানেই আর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার নেই। এখন থেকে ব্যাংক চলবে নিয়ম, যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে।
সম্প্রতি শীর্ষ ইংরেজি গণমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গভর্নর বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একক আধিপত্য রুখতেই পর্ষদের অন্তত ৫০ শতাংশ ‘স্বতন্ত্র পরিচালক’ রাখতে হবে, আর এক পরিবার থেকে পরিচালক সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে। এর মধ্য দিয়ে মালিকদের প্রভাব খাটিয়ে স্বার্থ রক্ষা বা অনিয়ম করার সুযোগ একরকম আইনি কাঠামোতেই রুদ্ধ হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা একটি প্যানেল করব, যেখান থেকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিতে হবে। প্যানেলের বাইরে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে।” এছাড়া, পেশাদার, অভিজ্ঞ ও ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ লোকদেরই এসব পদে নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে।
ব্যাংক মালিকদের উদ্দেশে গভর্নরের কড়া বার্তা—“ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থ হলে সরিয়ে দেওয়া হবে। মালিক মানেই যা খুশি তাই করার লাইসেন্স নয়। ব্যাংক চলে জনগণের টাকায়, মালিক কেবল তার জিম্মাদার।”
তিনি জানান, এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বিশেষ বিভাগ গঠন করা হয়েছে, যারা অনিয়ম দেখলেই হস্তক্ষেপ করবে। “যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, আমরা হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত,” বলেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতি অনুযায়ী, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আর চলতে দেওয়া হবে না। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করা হচ্ছে, পরে এর আওতায় আসবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একটি অংশও।
গভর্নর জানান, “কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া। তাদের তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হবে। এই প্রক্রিয়া চলমান এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।”
একই ধরনের অবস্থায় রয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যাদের খেলাপি ঋণ ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। তাদের মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ অথবা একীভূত করার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গভর্নর জানান, আরও ২০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অবসায়ন ও একীভূতকরণে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা রোধ করতে অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন, বিশেষ ‘জুডিশিয়াল ক্যাডার’ গঠন এবং আদালতে বেঞ্চ সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান গভর্নর আহসান মনসুর।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিচার বিভাগের সহযোগিতা প্রয়োজন। এজন্য প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।